Bangla24.Net

বুধবার, ১২ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

নাড়ির টান, ঈদযাত্রায় ভিড় কম ভাড়া বেশি

রোববার বেলা ১১টা, সিএনজি ও রিকশাযোগে কয়েকজন যাত্রী এসেছেন বাস টার্মিনালে। দেখামাত্রই টিকেট কাউন্টারের লোকদের ভিড় লেগে গেছে। কোথায় যাবেন তা তারা জানতে চায় যাত্রীদের কাছে। কেউ কেউ বলছে, রানিং গাড়ি আছে এখনই ছেড়ে যাবে। কেউ আবার আগ বাড়িয়ে হাতে টিকেটই ধরিয়ে দিচ্ছে।
তবে এসবকে পাশ কাটিয়ে সোজা কাউন্টারে যান যাত্রীরা। টার্মিনালের চিত্র দেখে বোঝার উপায় নেই দুই দিন পরে কুরবানির ঈদ। আর এটি দেশের অন্যতম বাস টার্মিনাল গাবতলীর চিত্র। একটা সময় এই টার্মিনালে ঈদের টিকেট পাওয়া দুষ্কর হলেও আজ তা সুদূর অতীত। পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে জৌলুস হারিয়েছে গাবতলী বাস টার্মিনাল। এখন প্রায়ই যাত্রীর খরা থাকে এ টার্মিনালে। ঈদুল ফিতর ও কুরবানির ঈদে কিছুটা ভিড় দেখা গেলেও তা মাত্র দুয়েকদিনের জন্য। একই চিত্র দেখা গেছে ট্রেন ও নৌপথেও।

তবে বাস মালিক ও শ্রমিকরা বলছেন, আজ অফিসের শেষ দিন হওয়ায় সব রুটেই চাপ বাড়বে ঈদযাত্রায়। রোববার রাজধানীর কয়েকটি বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলস্টেশন এবং সদরঘাটে সরেজমিন এমন চিত্রের দেখা মিলেছে।
রোববার গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা যায়, তেমন কোনো চাপ নেই। যাত্রীদের ডেকে টিকেট দিচ্ছে কাউন্টারের দায়িত্বরতরা। তবে এ দৃশ্যপট আজ (সোমবার) থেকে বদলে যাবে বলে জানান পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
শ্যামলি এনআর ট্রাভেলসের ম্যানেজার প্রভাত রায় সময়ের আলোকে বলেন, আজ (রোববার) পর্যন্ত যাত্রীর তেমন কোনো চাপ ছিল না। তবে সোমবার থেকে ঘরমুখো মানুষের ভিড় বাড়বে। মূলত গাবতলি বাস টার্মিনাল এখন উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের দিয়ে বেঁচে আছে। দক্ষিণবঙ্গের মানুষ পদ্মা সেতু দিয়ে চলে যাচ্ছে। অনেকে আবার পাটুরিয়া থেকে ভেঙে ভেঙে চলে যাচ্ছে। এ ছাড়া মোটরসাইকেল তো আছেই। সব মিলিয়ে যাত্রীরা এখন বহুমুখী পথ ব্যবহার করছে। যার কারণে তেমন চাপ নেই।
তিনি বলেন, আজ সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ১৫ থেকে ২০টি গাড়ি ছেড়ে গেছে। রাতে যাত্রী হলে আরও ১০ থেকে ১৫টি গাড়ি যেতে পারে। তবে ২২ তারিখ থেকে অনলাইনে টিকেট ছাড়ার পর ২৬ ও ২৭ তারিখের টিকেট প্রায় বুক হয়ে গেছে। এই দুদিন খুব চাপ থাকবে। যারা পাননি তারা ২৫ তারিখের টিকেট কেটেছেন। তবে এই মুহূর্তে যাত্রীদের আহামরি চাপ নেই। যাত্রীর চাপ বাড়লে ট্রিপ বাড়ানো হবে। তখন যাত্রীরা ইনস্ট্যান্ট টিকেট পেতে পারে। তবে কাউন্টারে এলে কেউ ফিরে যাবেÑএমনটি হবে না। কোনো না কোনো গাড়ির টিকেট পেয়েই যাবে। বাড়ি যেতে পারবে।
ভাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ঈদের সময় বিআরটিএর নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হয়। যেমন রংপুরের ভাড়া সাড়ে ৮০০ টাকা। এখনই সাড়ে ৬০০-৭০০ টাকা সরকারি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। কারণ এখন ৪০ বা ৩৬ সিট ভরে যাচ্ছে। কিন্তু ওই দিক থেকে একজন যাত্রীও আসছে না।
গাবতলী থেকে বগুড়া, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড়ে যাতায়াতের জন্য যাত্রীদের অন্যতম পছন্দের পরিবহন হচ্ছে শ্যামলি পরিবহন। একটি আইটি ফার্মে চাকরি করেন মো. সালাউদ্দিন সুমন (৩৫)।

তিনি বলেন, আমি রংপুরে যাব। মঙ্গলবার থেকে অফিস ছুটি হবে। কিন্তু পরিবার সঙ্গে থাকায় ঝামেলা এড়াতে একদিন আগেই ছুটি নিয়ে চলে যাচ্ছি। ঈদের পর একা এসে জয়েন করব। পরিবার পরে আসবে।
ভাড়ার বিষয়ে বলেন, ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে আড়াইশ’ টাকা বেশি নিয়েছে। আগে ছিল ৬০০ থেকে সাড়ে ৬০০। এখন নিল সাড়ে ৮০০।  শুধু শ্যামলি নয়, অন্য পরিবহনগুলোর চিত্রও ছিল একই রকম। বরিশালগামী শাকুরা পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার মো. শিপন সময়ের আলোকে বলেন, এখনও ঈদের চাপ তেমন শুরু হয়নি। সোমবার থেকে দুদিন যাত্রীদের চাপ থাকবে। এ ছাড়া বরিশালের বেশিরভাগ যাত্রী পদ্মা সেতু দিয়ে চলে যাচ্ছে।
রোববার বেলা ১১টার দিকে আবদুল্লাহপুর থেকে পঞ্চগড় যাওয়ার জন্য টিকেট কাটেন টাইলস মিস্ত্রি আল আমিন নামের এক যাত্রী। তিনি এদিন হানিফ পরিবহনে রাতে যাওয়ার উদ্দেশে টিকেট কাটেন। পঞ্চগরের স্বাভাবিক ভাড়া ১০৫০ টাকা। রোববার বাড়ি যাবেন-এ জন্য ভাড়া গুণতে হয়েছে ১২৩০ টাকা।
তিনি বলেন, সোম বা আগামীকাল মঙ্গলবার গেলে ভাড়া গুণতে হবে আরও বেশি-১৭শ থেকে ১৮শ টাকা। আল আমিনের চাচা রফিকুল ইসলাম বলেন, গত ঈদে পঞ্চগড়ের ভাড়া দিতে হয়েছে ১৭শ টাকা। পরিবারের তিনজনের জন্য অধিক ভাড়া হওয়ায় এবার তিনি বাড়ি যাচ্ছেন না। ঈদের পরে বাড়ি যাবেন বলে তিনি জানান।
হানিফ কাউন্টারের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা হলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঈদে সব রুটেই চাপ বেশি। এ জন্য একটু বেশি ভাড়া দিতে হয়। পথে অনেক খরচ হওয়ায় যাত্রীদের কাছ থেকে একটু বেশি ভাড়া আদায় করা হয়। সরেজমিন দেখা গেছে এক যাত্রীর কাছ থেকে মঙ্গলবার রাতের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়েছে ১৭শ টাকা। কিন্তু টিকেটের গায়ে লেখা ১৩শ টাকা।
মহাখালী বাস টার্মিনালে এবার যাত্রীর চাপ অনেক কম দেখা গেছে। টার্মিনালের ভেতর ছাপিয়ে বাসগুলো মূল রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

এনা পরিবহনের চালক খায়রুল ইসলাম বলেন, যাত্রী নেই বললেই চলে। দেখেন বাইরে সব বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে। যাত্রী থাকলে বাসগুলো রাস্তায় বসে থাকত না। তিনি বলেন, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ঈদ করব ভাবছিলাম। কিন্তু যে পরিস্থিতি ট্রিপ না পেলে স্ত্রী-সন্তানের জন্য কিছুই কেনা সম্ভব নয়।
রেলপথে যাত্রী বাড়তে পারে : বাস ও লঞ্চের যাত্রীর চেয়ে এবার ঈদে ট্রেনে যাত্রীর চাপ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। রোববার সকালে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে গিয়ে এমন আভাস মিলেছে কাউন্টার ও যাত্রীদের কাছ থেকে। রোববার বিমানবন্দর রেলস্টেশনে কথা হয় শাহরিয়ার নামে এক যাত্রীর সঙ্গে।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, মঙ্গলবার রাতে পরিবার নিয়ে কুড়িগ্রাম যাব। ভাড়া কিছুটা বেশি হলেও টিকেট পেতে বেগ পেতে হয়নি। অনেকে অগ্রিম টিকেট নিলেও মঙ্গলবার রাতের টিকেট পাওয়া গেছে।
তারা বলেন, আজ থেকে যাত্রীর চাপ বাড়বে। আগামীকাল মঙ্গলবার যাত্রীদের চাপ থাকবে অধিক। সদরঘাটেও যাত্রীর চাপ কম : ঈদ এলেই রাজধানীর সদরঘাটে নৌপথে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়ে। কিন্তু এবার তেমনটা দেখা যায়নি। অথচ এক সময়ে হাজার হাজার যাত্রীবোঝাই করে দক্ষিণাঞ্চলের লঞ্চগুলো ঘাট ছেড়ে যেতে দেখা যেত। পদ্মা সেতু নির্মাণের পর সেই চিত্র কিছুটা পাল্টে গেছে। অবশ্য রোববার সকালের দিকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এক রকম ফাঁকা থাকলেও বিকালের পর যাত্রীদের চাপ কিছুটা বাড়ে। তবে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। যদিও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন লঞ্চ কর্তৃপক্ষ।
তারা বলছেন এমনিতেই যাত্রী নেই, তেলের দামও বাড়তি। মালিকরা লোকসানের মধ্যে আছে। অনেকেই চাকরি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। তাই লঞ্চ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে মালিক-শ্রমিকদের ওপর সরকারের নজর দিতে হবে।
রোববার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিওটিএ) সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে বেলা ৩টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ে ২১টি লঞ্চ সদরঘাট ছেড়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বৃহস্পতিবার থেকে যাত্রীর সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য কিছু বেড়েছে। তবে লঞ্চ মালিকরা বলছেন, ঈদ উপলক্ষে সরকারি ছুটি এবং পোশাক কারখানাগুলোতে ছুটি শুরু হলে লঞ্চে যাত্রীর চাপ আরও বাড়বে। এ জন্য লঞ্চের সংখ্যা বাড়ানো হবে। এ ছাড়াও অগ্রিম টিকেট বিক্রি প্রায় শেষের দিকে। কিছু কিছু রুটের লঞ্চে ২৯ জুন পর্যন্ত কেবিনের টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে। কোনো কেবিন ফাঁকা নেই বলে জানান তারা।
রোববার সদরঘাটে সরেজমিন দেখা গেছে, সকাল বেলায় যাত্রীদের তেমন উপস্থিতি নেই। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর লঞ্চগুলো সদরঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। আর ঘরমুখোদের চোখেমুখে ছিল স্বস্তির ছাপ। সড়কপথের চেয়ে তুলনামূলক ভাড়া কম ও যাত্রাপথ আরামদায়ক হওয়াতেই যাত্রীর চাপ বাড়ছে বলে জানান তারা। তবে তাদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

পটুয়াখালীগামী এমভি কাজল-৭-এর যাত্রী মনিরুল ইসলাম তার দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, কিছুদিন আগে আমি লঞ্চের ডেকে করে ৩০০ টাকায় বাড়ি গিয়েছি। আজ সেই ভাড়া ৫০০ টাকা রাখা হয়েছে।
ঢাকা টু ভোলার ইলিশাগামী সম্পদ লঞ্চের যাত্রী নূরুন নাহার বলেন, এ লঞ্চে আগে সিঙ্গেল কেবিন ১২০০ টাকা, আর ডাবল ২৫শ টাকা নেওয়া হলেও এখন সিঙ্গেল ২ হাজার এবং ডাবল কেবিন ৪ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রথমে লঞ্চের কর্মচারীরা বলে কোনো কেবিন ফাঁকা নেই। তবে বেশি টাকা দিলেই কেবিনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। তবে কেবিন মাস্টার হোসেন আলী অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
বরগুনার যাত্রী জহিরুল বলেন, আগে বাড়ি যেতে বেশ ঝামেলা হতো। টিকেট পাওয়া যেত না। এখন সে অবস্থা নেই। ঘাটে এসেই টিকেট পেয়েছি। কিন্তু সিঙ্গেল রুমের ১৩০০ টাকার কেবিন ভাড়া আমার কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নিয়েছে।
ঢাকা-গলাচিপা রুটে চলাচলকারী পূবালী লঞ্চের সুপারভাইজার মোশাররফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার প্রশ্নই উঠে না। বরং কিছুটা কম নেওয়া হচ্ছে। ডেকে ৫০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ১৩০০ টাকা, আর ডাবল ২৫শ নেওয়া হচ্ছে।
এমভি কাজল-৭-এর ম্যানেজার মোতালেব খান বলেন, একটা লঞ্চের আসা-যাওয়ায় ৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়। এ ছাড়া কর্মচারীদের খাওয়া-দাওয়া আর বেতন তো আছেই। এখন যাত্রী না থাকলে এই খরচ উঠবে কীভাবে। আমরা মালিককে যদি টাকা না দিতে পারি তাহলে মালিক তো আর নিজের পকেট থেকে কর্মচারীদের বেতন দেবে না। তবুও আমরা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে টিকেটের দাম কম নিচ্ছি।
সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে বিআইডব্লিটিএর সদরঘাট নৌ-থানার পুলিশের কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই আবদুল মান্নান সময়ের আলোকে বলেন, ঈদে ঘরে ফেরা নিশ্চিত করতে মানুষের নিরাপত্তার জন্য সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ ও নৌ পুলিশের পাশাপাশি ঘাট এলাকায় র‍্যাবের একটি টিম নিয়োজিত রয়েছে। আমরা ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করছি।
শেয়ার