Bangla24.Net

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ১২

নাটোরের বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে বাবা-মেয়েসহ ১২ জন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর আহত যাত্রীদের মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

“ভোরের দিকে চালক গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে গাড়ি বাম পথ থেকে ডানে চলে গেলে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এরপর চেতনা ফিরলে দেখি কয়েকজন আমাদের মোবাইল, মানিব্যাগ, পকেটের টাকা নিয়ে যাচ্ছে।”

এভাবে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে বেঁচে যাওয়া এক আহত যাত্রী।

আহত যাত্রী সোহেল রানা বলেন, “ঘটনার পরপর কিছু মানুষ যাত্রীদের মালামাল লুটপাট শুরু করেন। বাসের মধ্যে আটকে থাকার কারণে আমরা কিছুই বলতে পারছিলাম না। তবে কিছু মানুষ উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের সহযোগিতাও করেছেন।”

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক।

এতে বাবা-মেয়েসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩০ জন।

নিহতরা হলেন—রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ারুল হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিধখালী গ্রামের আজহার হাওলাদারের ছেলে শহীদুল ইসলাম (৪৫) ও তাঁর মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহরউদ্দিনের ছেলে জুয়েল (৪০), একই উপজেলার ডুবি সাহিবর গ্রামের ইউনুস আলী শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০), জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে আব্দুস সালাম মোল্লা (৪৬), আরব আলী ফকিরের ছেলে আব্দুস সামাদ ফকির (৭০), পালের চর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহীন আহমেদ (৩২), ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়ীয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে ট্রাকচালক আবু কালাম (৫৫), নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে রাসেল (৩৩) এবং ফরিদপুর সদর উপজেলার বাখোন্দিয়া গ্রামের অমর কুমার জমাদারের ছেলে হিমেশ জমাদার (৩৫)।

আহতদের মধ্যে যাঁদের পরিচয় পাওয়া গেছে, তাঁরা হলেন—শরীয়তপুরের আলমগীর মাতবর (৫৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুস সালাম (৩৫), শিবগঞ্জের ওয়াহিদ আলী (২২), মাদারীপুরের নাইম তালুকদার (২০), নার্গিস আক্তার (৩৫), বরগুনার জেসমিন আক্তার (৩৫), নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার চিরঞ্জিত কুমার (২৫), মান্দা উপজেলার মানিক হোসেন (৩৭), শাহাজুল ইসলাম (৩৬) এবং লক্ষ্মীপুর জেলার রাকিব হোসেন (২৫)। অন্যদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বলেন, ভোরে নাটোর থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী যাত্রীবাহী আরপি স্পেশাল বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। আহতদের উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে নেওয়া হয়।

তবে আহতদের মধ্যে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

নাটোর ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আক্তার হামিদ বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

দুর্ঘটনার পর হতাহতদের মালামাল লুট

বাসের আহত যাত্রী রাকিব হোসেনসহ আরও কয়েকজন বলেন, চেতনা ফিরলে তাঁরা দেখেন, কয়েকজন লোক তাঁদের মোবাইল, মানিব্যাগ ও টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। বাসে আটকে থাকার কারণে তাঁরা কিছুই বলতে পারছিলেন না। তবে কিছু মানুষ তাঁদের বাস থেকে বের হতে সহযোগিতা করেছেন।

লুটপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, কিছু মানুষ সব জায়গাতেই আছেন, যাঁরা বিপদের মধ্যেও মানুষকে অসহযোগিতা করেন।

“ঘটনার পর দেড় লাখ টাকা ও কিছু মালামাল উদ্ধার করছি, সেগুলো আহত ও নিহতদের স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে”, বলেন তিনি।

নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভুল তথ্য

দুর্ঘটনার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন। তিনি বলেন, বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩০ জন।

যদিও পরে মরদেহ বনপাড়া হাইওয়ে থানায় নিয়ে আসার পর জানা যায়, ১৪ জন নয়, ১২ জন মারা গেছেন। তখন নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, “এটাই কনক্রিট তথ্য, ১২ জন মারা গেছেন, ১৪ জন নয়।”

জেলা প্রশাসকের ভুল তথ্যের বিষয়ে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম বলেন, “বনপাড়া হাইওয়ে থানা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা তাড়াহুড়ো করে ভুল তথ্য দেওয়ার কারণে জেলা প্রশাসককে এবং আমাদেরও ভুল হয়ে গেছে।”

দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে তদন্ত কমিটি গঠন

ঘটনার খবর পেয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ, জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক ও ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

এ সময় নিহতদের স্বজনদের জন্য আর্থিক সহায়তাসহ সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন তাঁরা।

হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।

নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতকে প্রধান করে সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার।

পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর

পরিচয় শনাক্তের পর থেকেই শুরু হয় মরদেহ হস্তান্তরের কার্যক্রম। একেকটি পরিবার যখন থানায় এসে তাদের প্রিয়জনের মরদেহ চিনতে পারছিল, তখন তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছিল চারপাশের পরিবেশ।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, “আমরা ১২টি পরিবারের কাছে ১২ জনের মরদেহ হস্তান্তর করেছি। যে মালামালগুলো তারা চিহ্নিত করেছে, সেগুলো তাদের পরিবারকে দিয়ে দেওয়া হয়।”

শেয়ার