Bangla24.Net

শনিবার, ১৩ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে চৈত্র, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

এক যুগেও সবাই পায়নি স্মার্ট এনআইডি কার্ড

এনালগ থেকে ডিজিটাল, ডিজিটাল থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বির্নিমাণের পথে সরকার। তবে এখনও দেশের ১৭৫ উপজেলার নাগরিকদের হাতে পৌঁছেনি স্মার্ট এনআইডি কার্ড। আর মোট উপজেলার অন্তত ৩০ শতাংশ উপজেলা এখনও স্মার্ট এনআইডি কার্ডের বাইরে। যদিও প্রত্যেক ভোটারকে স্মার্ট এনআইডি কার্ড দেয়ার জন্য এক যুগ আগে এনহান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) নামের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই সময়ে ৬ বার মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালে শেষ হয়েছে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়।

অন্যদিকে ২০২০ সালে নেয়া দ্বিতীয় পর্যায়ের মেয়াদও ৩ বছর পার হয়েছে। বাকি ২ বছরে প্রত্যেক উপজেলায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ করা সম্ভব হবে কি না এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আশা, নভেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে সব উপজেলায় স্মার্ট এনআইডি কার্ড বিতরণ করা হবে।

ইসি সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরির সময় অতিরিক্ত (বাই প্রোডাক্ট) হিসেবে কাগজে ছাপানো একটি পরিচয়পত্র দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু ওই পরিচয়পত্র যন্ত্রে পাঠযোগ্য নয়। ফলে ৯ কোটি নাগরিককে স্মার্ট কার্ড দিতে ২০১১ সালে আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) নামে ৫ বছরের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র প্লাস্টিক কার্ডে তৈরি, যা যন্ত্রে পাঠযোগ্য। এর সঙ্গে একটি চিপ রয়েছে। এর জন্য ব্যক্তির বর্তমান জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা তথ্যের পাশাপাশি ১০ আঙুলের ছাপ ও আইরিশের প্রতিচ্ছবি নেয়া হয়। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল একটি নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য স্মার্ট এনআইডি সিস্টেম গড়ে তোলা।

ওই সময় প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত। কাজের অগ্রগতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ৬ দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। ৫ বছরের জায়গায় ১২ বছর পার হলেও এখনও সবার হাতে পৌঁছেনি স্মার্ট কার্ড।

ইসির তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ থাকা প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬৯৬৬৩.৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে জিওবি ছিল ৮৯৮৫৯.৫০ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য ৭৯৮০৪.০৭ লাখ টাকা। প্রকল্প নেওয়ার প্রায় ৪ বছর পর ২০১৫ সালে স্মার্ট কার্ড উৎপাদন-বিতরণের জন্য ওবারথার টেকনোলজিসের সঙ্গে চুক্তি হলেও স্মার্ট কার্ড বিতরণ শুরু হয় ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর থেকে। ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এই বিষয়ে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরে সরকারি তহবিল থেকে এই প্রকল্পের ব্যয় মেটানো হয়।

এরই মধ্যে ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর আইডিয়া-২ প্রকল্প একনেকে পাস হয়। সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৮০৫ কোটি ৯ লাখ টাকা। এর মেয়াদকাল ধরা হয় ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এই প্রকল্পের অধীনে ৩ কোটি নাগরিকের হাতে স্মার্ট কার্ড তুলে দেয়ার কথা রয়েছে। তবে এই প্রকল্পের মেয়াদও ৩ বছর পার হয়ে গেছে।

প্রকল্পের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৩২৫টি উপজেলায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে আরও ১৭টি উপজেলায় চলছে বিতরণ কার্যক্রম। এই কার্যক্রম শেষ হলে আরও ২৩ উপজেলায় শুরু হবে বিতরণ কার্যক্রম, তবে কবে নাগাদ কোন কোন উপজেলায় বিতরণ হবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এদিকে এখন পর্যন্ত দেশের ১৫২টি উপজেলার স্মার্ট কার্ড মুদ্রণ শুরুই হয়নি।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব জেলার স্মার্ট কার্ডই প্রিন্ট হচ্ছে। বর্তমানে দেশের ১৭টি উপজেলায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া মুদ্রণ করা হয়েছে, কিন্তু বিতরণ শুরু হয়নি এমন উপজেলার সংখ্যা ২৩টি। আর অমুদ্রিত রয়েছে ১৫২টি উপজেলার কার্ড। সব মিলিয়ি দেশের ১৭৫টি উপজেলার নাগরিকরা এখনও স্মার্ট কার্ডের বাইরে। পারসো সেন্টারে আছে ৩টি উপজেলার স্মার্ট কার্ড। বাকি স্মার্ট কার্ড মুদ্রণ শেষে পর্যায়ক্রমে সব জেলা ও উপজেলায় বিতরণ করা হবে। প্রকল্পের উল্লিখিত মোট কার্ডের মেয়াদ কালের (৩০ নভেম্বর ২০২৫) মধ্যে পর্যায়ক্রমে সব উপজেলায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ করা হবে বলে জানিয়েছে ইসি।

প্রকল্প সূত্রে যানা গেছে, আইডিইএ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে মোট ৯ কোটি ৮ লাখ কার্ড ক্রয় করা হয়। এর মধ্যে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রিন্ট হয়েছে ৮ কোটি ৩০ লাখ ৫৮ হাজার ৫৬০টি কার্ড। আর প্রিন্টের অপেক্ষায় আছে ৫৯ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮৭ স্মার্ট কার্ড। গড়ে প্রতিদিন ৫০ হাজার কার্ড প্রিন্ট করা হচ্ছে। অন্যদিকে, আইডিইএ ২য় পর্যায় প্রকল্পের মাধ্যমে ২ কোটি ৩৬ লাখ কার্ড ক্রয়ের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে এই কার্ড হাতে পাওয়া যাবে বলে আশা করছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

শুরু থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে কতটি উপজেলায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ করা হয়েছে জানতে চাইলে প্রকল্পের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশের ৩২৫টি উপজেলায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলাতেই পর্যায়ক্রমে স্মার্ট কার্ড বিতরণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমানে ১৭টি জেলায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমে পরিকল্পনা অনুয়ায়ী প্রিন্ট সাপেক্ষে অন্যান্য উপজেলাতেও স্মার্ট কার্ড বিতরণের কাজ শুরু হবে।

প্রবাসীরা কীভাবে স্মার্ট কার্ড পাবেন জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ইতালি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে এনআইডি নিবন্ধন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পর্যায়ক্রমে ৪০টি দেশে এই কার্যক্রম চলবে। প্রবাসীদের এনআইডি আবেদন অনুমোদন হলে প্রিন্টপূর্বক সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশি দূতাবাসে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সেখান থেকে প্রবাসীরা তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করবেন। স্মার্ট কার্ড হারিয়ে গেলে কিংবা ভুল সংশোধন করলে পুনরায় কীভাবে পেতে পারে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা জানান, একজন ভোটারকে কেবল একবারই স্মার্ট কার্ড দেয়া হবে।

আইডিইএ (২য় পর্যায়) প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ সায়েম বলেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি প্রতিনিয়তই দেওয়া হবে। মাঝখানে নির্বাচনের সময় কিছু দিন বন্ধ ছিল। যখন যে উপজেলায় শেষ হচ্ছে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ফিল্ডে পাঠিয়ে দিচ্ছি। একটি উপজেলায় শেষ হলে আরেকটি উপজেলায় বিতরণ শুরু করছি। দেশের ১৫২টি উপজেলায় স্মার্ট কার্ড বিতরণ এখনও বাকি আছে। কোনো টেকনিক্যাল সমস্যা না হলে আমরা যত দ্রুত সম্ভব দিতে চেষ্টা করব। আমাদের পরিকল্পনা আছে-পাইপলাইনে যে কার্ড আছে সেগুলো হাতে পেলে ২০২৫-এর ডিসেম্বরের মধ্যে সব কার্ড বিতরণের চেষ্টা করব।

ইসির সর্বশেষ তথ্যানুযায়ি, দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ১৭ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ২০ লাখ ৯০ হাজার ১৩৭ জন, নারী ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৯ জন, হিজড়া ৯২৪ জন।

সৌজন্যে : সময়ের আলো

শেয়ার