Bangla24.Net

শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ , ১০ ফাল্গুন ১৪৩০

বিয়ানীবাজার ক্যানসার হাসপাতাল

প্রবাসীদের অর্থে চলা ‘আশার বাতিঘর’

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় প্রবাসীদের একটি উদ্যোগ আলো ছড়াচ্ছে। তাদের অনুদানে পরিচালিত বিয়ানীবাজার ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার মানুষকে আশার আলো দেখাচ্ছে। দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ প্রদানের পাশাপাশি অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে রোগ নির্ণয় করে সামর্থ্যবানদেরও দেয়া হচ্ছে চিকিৎসাসেবা।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিমের সহযোগিতায় ক্যানসারের পাশাপাশি সাধারণ রোগব্যাধিরও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফলে সীমান্তবর্তী বিয়ানীবাজার উপজেলাসহ পাশর্^বর্তী জকিগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখার রোগীদেরও আশার বাতিঘর হিসেবে দাঁড়িয়েছে বিয়ানীবাজার ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল।

এই উদ্যোগের পথিকৃৎ ব্যক্তি সমীরণ দাস। তিনি ভারতের কলকাতায় ক্যানসার সচেতনতা সৃষ্টি ও দ্রুত শনাক্তকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তার আদিপুরুষের বাসস্থান সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায়। পিতৃভূমির প্রতি তার আলাদা টান রয়েছে। নিজ দেশে ক্যানসারের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করার পাশাপাশি ২০০১ সালে ব্রিটেন সফরকালে তিনি বিয়ানীবাজারের প্রবাসীদের ক্যানসারের সচেতনতা এবং দ্রুত শনাক্তকরণে উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাব দেওয়ার পর বিয়ানীবাজারের প্রবাসীরা তা গ্রহণ করেন। উদ্যোক্তারা তাকে ট্রাস্টি ও কনসালট্যান্ট হিসেবে যুক্ত রেখেছেন হাসপাতালের সঙ্গে।

হাসপাতালের ট্রাস্টি ও কনসালট্যান্ট সমীরণ দাস বলেন, এ হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরি ২০০১ সালে। বাংলাদেশি প্রবাসীরা বিশেষ করে বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতি ২০০৯ সালে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। আমার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হওয়ায় আমি অনেক খুশি। কারণ ক্যানসারের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য আমি কাজ করে যাচ্ছি।

বিয়ানীবাজার ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের কান্ট্রি ডিরেক্টর তোফায়েল খান উপজেলা পর্যায়ে বিয়ানীবাজার ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দক্ষ জনবলের অভাবকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, ক্যানসার হাসপাতালের দক্ষ জনবল পাওয়া যায় না। মফস্বল এলাকা হওয়ায় কেউই থাকতে চান না এখানে। আর যারা থাকেন, তারাও বাধ্য হয়েই থাকেন, কারণ অন্য কোথাও চাকরি না থাকলেই কেবল এখানে থাকেন।

একটু ভালো সুযোগ পেলেই চলে যান। তাই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দক্ষ চিকিৎসকদের বিয়ানীবাজার ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়। নিয়মিত ৬ জন চিকিৎসকের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও নির্দিষ্ট দিনে এখানে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া অ্যান্ডোস্কপি, কোলোনস্কপি করার অত্যাধুনিক মেশিনও স্থাপন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এর সুফলও পাচ্ছেন রোগীরা।

তিনি বলেন, বিয়ানীবাজার ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ক্যানসার চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যাতে বাইরে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে পারেন। এ ছাড়া ঢাকায় একটি এনজিওর সঙ্গে চুক্তি রয়েছে, যারা দেড়শ টাকায় থাকার ব্যবস্থা এবং ৫০০ টাকার বিনিময়ে সারাদিন বিভিন্ন টেস্ট করাতে নিয়ে যান। এ ছাড়া ক্যানসার ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গেও লিংকআপ করিয়ে দেওয়া হয়, যাতে দরিদ্র রোগীরা সহজে, স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন।

সমীরণ দাস কলাকাতায় দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারের সচেতনতা ও দ্রুত শনাক্তকরণের ওপর কাজ করে আসছেন। তিনি ব্রিটেনে বিয়ানীবাজারবাসীর কাছে ক্যানসারের সচেতনতা ও দ্রুত শনাক্তকরণের উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান। তার এ আহ্বানে সাড়া দেন প্রবাসীরা। তারপর বিয়ানীবাজারের কলেজ রোডে সরকারি জমি লিজ পেলেও কাজ শুরু করা যায়নি। কারণ সরকারের পলিসিতে ক্যানসারের সচেতনতা ও দ্রুত শনাক্তকরণের জন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হন উদ্যোক্তারা।

বিয়ানীবাজার ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের ডেপুটি ম্যানেজার ওলিউর রহমান বলেন, প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ বিতরণ করা হয়। ক্যানসার রোগীদের জন্য আলাদা হেল্প ডেস্ক এবং সাধারণ রোগীদের জন্যও হেল্প ডেস্ক রয়েছে। পাশাপাশি যাদের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তাদেরও সাশ্রয়ী মূল্যে বিভিন্ন সেবা যেমন, কলোনস্কপিসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

জকিগঞ্জ থেকে আসা এক বৃদ্ধার গালে ক্যানসার ধরা পড়েছে। তিনি বোনকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ইতিমধ্যে তার আক্রান্ত স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তার চিকিৎসার ব্যয়ভারও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহন করবে বলে তিনি আশাবাদী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কলেজের এক ছাত্রী জানান, স্তন ক্যানসার মারাত্মক রোগ। আমরা অনেক সময় লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি প্রকাশ করি না। বিয়ানীবাজার ক্যানসার হাসপাতাল গ্রামে গিয়ে যে মেডিকেল ক্যাম্প করে, তাতে অনেকের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. এম ফয়েজ আহমদ বলেন, ক্যানসার একটি ব্যয়বহুল চিকিৎসা। বিয়ানীবাজার ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল একটি অ্যাসোসিয়েট প্রতিষ্ঠান। এখানে সাধারণ রোগীরা আসেন। তাদের চিকিৎসা চলে, এর মধ্যে কারও কারও ক্যানসার শনাক্ত হয়। প্রাথমিকভাবে ক্যানসার শনাক্ত হলে রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কিংবা লক্ষণ থাকলে তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আর ক্যানসার শনাক্ত হলে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সিলেট কিংবা ঢাকায় পাঠানো হয়।

বিয়ানীবাজার ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের সিইও এম. সাব উদ্দিন বলেন, এ হাসপাতালটি চ্যারিটির ওপর নির্ভরশীল। আমিও এ হাসপাতালের সিইও হিসেবে আমি কোনো বেতন-ভাতা কিংবা সম্মানী নিই না। ব্রিটেন থেকে বার বার আসা যাওয়ার জন্যও যাতায়াত ভাতা পর্যন্ত গ্রহণ করিনি। তিনি বলেন, এ হাসপাতাল স্থাপনে সরকারের প্রতিটি বিভাগ থেকে সহযোগিতা পেয়েছি।

আমরা হাসপাতাল পরিচালনায় প্রথমে লিগ্যাল বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছি। হাসপাতালের লাইসেন্স গ্রহণ, পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্রসহ সব অনুমোদন আপডেট করে কাজ পরিচালনা করে আসছি। হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আমরা প্লান্ট করেছি। ক্যানসারের জীবাণুসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের বা রোগীর বর্জ্য যাতে যেখানে সেখানে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য বর্জ্য গ্রহণে আমরা বিভিন্ন রঙের বাকেট ব্যবহার করি।

সিইও এম সাব উদ্দিন আরও বলেন, ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ৫০ হাজার রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্যানসার সচেতনতা সৃষ্টিতে গ্রামে গ্রামে মেডিকেল ক্যাম্প করা হচ্ছে। অনেক সময় মেডিকেল ক্যাম্পে নারীদের ক্যানসারের লক্ষ্মণ এবং ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে। একটি ক্যাম্পে ৬ জন নারীর প্রাথমিকভাবে ক্যানসার শনাক্ত হয়। শুরুতে শনাক্ত হওয়ায় তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেছে। এ ছাড়া সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে গ্রামে গ্রামে।

তিনি আরও বলেন, দেশে প্রথমবারের মতো সমাজসেবা অধিদফতরে উপজেলা পর্যায়ে বেসরকারি হাসপাতালে রোগী কল্যাণ সমিতি অনুমোদিত হয়েছে। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সমিতির সম্পাদক হিসেবে কাজ করবেন। তিনি দরিদ্র রোগী বাছাই করে সরকারের অনুদান এনে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। ইতিমধ্যে এ সমিতির কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

এদিকে উদ্যোক্তারা স্বপ্ন দেখছেন, এ ধরনের হাসপাতাল দেশের প্রতিটি উপজেলায় ছড়িয়ে দিতে। ইতিমধ্যে হাসপাতালের জন্য সিলেট নগরীতে ১৫ শতক ভূমি দান করেছেন এক প্রবাসী। আর্থিক সংস্থান হলেই সিলেটেও যাত্রা শুরু করবে ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের একটি শাখা। ধীরে ধীরে সারা দেশে ক্যানসার সচেতনতা সৃষ্টি ও চিকিৎসা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছেন তারা।

সৌজন্যে : সময়ের আলো

শেয়ার