Bangla24.Net

বৃহস্পতিবার, ৩০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বিএনপি-জামায়াতের সুমতি হোক, অগ্নিসন্ত্রাস বন্ধ করুক

বিএনপি-জামায়াতের অবরোধ কর্মসূচির ফলে সৃষ্ট নানা সংকটের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি এটুকু বলবো যে ওদের সুমতি হোক। এই ধ্বংসযজ্ঞ ও অগ্নিসন্ত্রাস বন্ধ করুক।’

মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা সরণি (পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে) এবং চট্টগ্রামের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ ১৫৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার ৪১টি স্থাপনা উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন। এসময় দেশের ৬৪টি জেলার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ ১০১টি প্রান্ত ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিল।

এসব প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে ৯৭ হাজার ৪৭১ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৬৪৪টি বিভিন্ন উন্নয়ন অবকাঠামো উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ৫ হাজার ৩৯৭ ঘর হস্তান্তর করা হয়।

এসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। হয়তো দু-একদিনের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তারিখ ও সময় (তফসিল) ঘোষণা করবে। জনগণের ভোটের অধিকার আমরাই নিশ্চিত করেছি। কাজেই জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের ভোট দেবে।’

তিনি বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘অনেকে নির্বাচনে আসতে চায় না। কারণ যারা (২০০৮ সালে) ৩০টি সিট পেয়েছিল, স্বাভাবিকভাবে তাদের নির্বাচনে আসার কোনও আকাঙ্ক্ষাই থাকবে না। নির্বাচন বানচাল করে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে আবার বাংলাদেশের মানুষকে ভোগান্তির মধ্যে ফেলাই তাদের চেষ্টা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি এ দেশের মানুষ একটু শান্তিতে ছিল, স্বস্তিতে ছিল; উন্নয়ন দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময়ে এই অবরোধ আর অগ্নিসন্ত্রাস-জ্বালাও পোড়াও। গাড়িতে আগুন বাসে আগুন দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত করা হচ্ছে, স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা ঠিকভাবে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারছে না। তাদের লেখাপড়া নষ্ট হচ্ছে।’

‘অথচ বিএনপির আমলে যেখানে সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ৪৫ ভাগ, সেখান থেকে বর্তমানে আমরা সাক্ষরতার হার ৭৬ দশমিক ৬ ভাগে উন্নীত করেছি। আজকে সমস্ত ছেলেমেয়ে, প্রায় ৯৮ ভাগ ছেলেমেয়ে স্কুলে যাচ্ছে। সেসব কিছু আজ ব্যাহত করার চেষ্টা করা হচ্ছে’, বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমি এটুকু বলবো যে ওদের সুমতি হোক। এই ধ্বংসযজ্ঞ তারা বন্ধ করুক। অগ্নিসন্ত্রাস বন্ধ করুক।’

অগ্নিসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘দেশবাসীকেও বলবো যে এই অগ্নিসন্ত্রাস আপনাদের প্রতিরোধ করতে হবে। সবারই জানমাল আছে। ২০১৩, ১৪ ও পরবর্তী সময়ে যে অগ্নিসন্ত্রাস, ভুক্তভোগীদের যন্ত্রণা ও কষ্ট আমরা দেখেছি। কাজেই এই ভোগান্তি যেন মানুষের আর না হয়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ আমরা যে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি, তা আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। সে জন্য সরকারের ধারাবাহিকতাও প্রয়োজন।’ এসময় প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পরবর্তী সময়ে ‘বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুঃশাসনের’ চিত্র তুলে ধরেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে এসে দেশকে খাদ্য ঘাটতির একটি দেশ হিসেবে পেয়েছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, ৪০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য ঘাটতি ছিল, উৎপাদন হতো ৬৯ বা ৭৯ লাখ মেট্রিক টন। সে সময় তার সরকার গবেষণা ও খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিয়ে আলাদা বরাদ্দ দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলে। সে সময় চালের দাম ছিল মাত্র ১০ টাকা। মূল্যস্ফীতি ছিল ১ দশমিক ৫০ শতাংশ। যখন তার মেয়াদ শেষে দেশে প্রথমবারের মতো শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, তখন ২৬ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য দেশে উদ্বৃত্ত রেখে যান। পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দেশকে আবার খাদ্য ঘাটতির দেশে পরিণত করে।

দেশের গ্যাস বিক্রির দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে রাজি না হওয়ায় ভোট বেশি পেলেও পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, এরপর বাংলাদেশে দুরবস্থা সৃষ্টি হয়। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-বাংলাভাই-বোমা হামলা, গ্রেনেড হামলা, একইসাথে ৫শ’ জায়গায় বোমা হামলা- এগুলো বাংলাদেশের মানুষকে মোকাবেলা করতে হয়। ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পর থেকে ’৭১০এর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার মতো বর্বরতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ। আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীও এরকম নির্যাতনের শিকার হয়। আইনজীবী হত্যা, জেলা জজকে বোমা মেরে হত্যা এমনকি ছয় বছরের ছোট্ট শিশুও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ থেকে রেহাই পায়নি। অনেক মেয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। এদের বিরুদ্ধে মামলা করায় ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হতে হয়। দুর্নীতিতে বাংলাদেশ পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। আর এই অবস্থার জন্যই দেশে জরুরি অবস্থা আসে।

২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩৩টি আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। যেখানে বিএনপি ৩০টি আসন পেয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয় যখন, নির্বাচন বানচালের অনেক চেষ্টা হয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট দেশে অগ্নিসন্ত্রাস শুরু করে। এরপর ২০১৮’র নির্বাচনেও একই ঘটনা ঘটায় তারা।

সরকার প্রধান বলেন, আমরা জনগণের ভোটেই বারবার নির্বাচিত হয়ে এসেছি। আওয়ামী লীগ কোনোদিন গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ছাড়া সরকার গঠন করে নাই।

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ যাতে সুষ্ঠুভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেজন্য আইন করে নির্বাচন কমিশন গঠন, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন তথা নির্বাচন ব্যবস্থার যাবতীয় সংস্কার আওয়ামী লীগের প্রস্তাবেই করা হয়েছে। কারণ, রাতের অন্ধকারে অস্ত্র তুলে ক্ষমতা দখল করে জনগণের ভাগ্য নিয়ে আর কেউ যেন ছিনিমিনি খেলতে না পারে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।

আজ দেশের যে প্রভূত উন্নয়ন তা দীর্ঘসময় একটানা ক্ষমতায় থাকতে পারার জন্যই বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সক্ষমতা ১৬০০ মেগাওয়াট ছিল; তা বর্তমানে ২৮ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে উন্নীত হয়েছে। প্রতি ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বেলেছে সরকার। অথচ তার সরকার ১৯৯৬ সালে পাওয়া ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকে উৎপাদন বাড়িয়ে ক্ষমতা ছাড়ার সময় ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে রেখে যায়। কিন্তু পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত সরকার এক ইউনিটও উৎপাদন না বাড়িয়ে উল্টো বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩ হাজার মেগাওয়াটে নামিয়ে আনে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকারের সাড়ে ১৪ বছরে আজকের বাংলাদেশ বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশকে আর কেউ অবহেলার চোখে দেখে না। বাংলাদেশ আজকে বিশ্বে একটি মর্যাদাশীল দেশ। উন্নয়নের রোল মডেল।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সেই মর্যাদাটা আমরা আবার ফিরিয়ে আনতে পেরেছি, যেটা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর আমরা পেয়েছিলাম।’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে ২০৪১ সাল নাগাদ স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ায় কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো.তাজুল ইসলাম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং খাদ্যমন্ত্রী সাধান চন্দ্র মজুমদার মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

১১টি জেলাকে ও ৬০টি উপজেলাকে ভূমিহীন-গৃহহীনমুক্ত ঘোষণা

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাংলায় কেউ ভূমিহীন-গৃহহীন থাকবে না,’ তার এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে ১১টি জেলা ও ৬০টি উপজেলা সম্পূর্ণ ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত বলে ঘোষণা করেন। জেলাগুলো হচ্ছে; টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, পটুয়াখালী, সিলেট ও মৌলভীবাজার। এ নিয়ে দেশের মোট ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত জেলার সংখ্যা দাঁড়ালো ৩২টি এবং উপজেলার সংখ্যা দাঁড়ালো ৩৯৪টি।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

শেয়ার